ছোট গল্প
কঠিন_শিক্ষা
সমরেশ সুবোধ পড়িয়া
শনিবার, খেজুরি
মুম্বই থেকে আসার পরে চৌদ্দদিন হোম কোয়ারেন্টাইন এর গ্রীলবাস কাটিয়ে প্রথম আলোর মুখ দেখলাম, আজ৷ সাত সকালে বাড়িতে এক স্বামী-স্ত্রী যুগল সাহায্য চাইতে এসেছিল৷ তাঁদের পরণে সাঁওতালি পোশাক, অথচ তারা বললো; আমরা বাজকুলের অধিবাসী৷ মহিলার পোশাকে, মাথার কমলা রঙের সিঁদুর ও কথাবার্তায় পুরো ঝাড়গ্রামের ভাষার ছাপ৷ জিজ্ঞাসা করতে বললো; বাপের বাড়ি - এগরা৷
তাঁদের চোখেমুখে এতটুকূও কষ্টের ছাপ নেই৷ স্বামী বলছে; আমি কনস্ট্রাকশনের কাজে ব্যাঙ্গালোরে ছিলাম৷ একজন পরিযায়ী শ্রমিক৷ লকডাউনের পূর্বেই বাড়িতে ফিরে এসেছি৷ হাতে কোনও কাজ নেই৷ বাড়িতে বাবা বড্ড অসুস্থ৷ মায়ের ক্যান্সার৷ অর্থ খাদ্য নেই, তাই চাইতে আসা৷ মায়ের কথা বলতে আমার মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল৷
একটু শক্ত হয়ে বললাম; "অনেকেই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ভিক্ষা চায়৷ তোমাদের পোশাক দেখে বোঝা যাচ্ছে না, তোমরা সত্য বলছো, কি মিথ্যা! এখন সরকারতো বিনে পয়সায় খাদ্যদ্রব্য দিচ্ছে রেশনে৷ যাইহোক, তোমাদের আমি দশ টাকার বেশী দিতে পারবো না৷ নেওয়া না নেওয়া তোমাদের ইচ্ছা৷" ওরা প্রথমে আর একটু বেশী চাইতে শুরু করে - নানারকমের অনুনয় বিনয় করতে লাগলো৷ আর বলতে লাগলো; এখন কাজ নেই, কেউ কাজ দেয় না... ইত্যাদি ইত্যাদি ৷
আমফান ঝড়ে আমাদের কিছু আম গাছ পড়ে গিয়েছিল, সেগুলো কাটা হয়েছে বটে, ডালপালাগুলো যত্ন করে কেটে গুছিয়ে রাখা হয়নি৷ আমি তখন জড়ো করে রাখা শুকনো ডালপালা দেখিয়ে বললাম; আমি ডালপালা কাটার অস্ত্র দিচ্ছি, ওগুলো কেটে গুছিয়ে দাও, এটি করতে সময় লাগবে বড্ডজোর দুই থেকে আড়াই ঘন্টা, বিনিময়ে দুইশত টাকা আর বস্তা দুই-তিনেক শুকনো পাতা জ্বালানী নিয়ে যেতে পারো, তোমাদের রান্নার জন্য৷ ওরা এক মিনিট চিন্তা না করেই দু'জনেই একসঙ্গে বললো; এখন হবে না, অন্যদিন!
এই অন্যদিনের অছিলায় (বাহানায়) ওরা চলে গেল৷ একসঙ্গে চৌদ্দদিন কোয়ারেন্টাইনে কাটানো আমার ভাগ্নে প্রসেনজিৎ মুম্বই ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রিজ এর ক্যামেরাম্যান বললো; মামা, এরা কাজ করে উপার্জনকরা কর্মী মানুষ নয়৷ "বাবামা অসুস্থ" এই সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে৷ আর বেশী বেশী সাহায্য চায়৷ এরা ক্লাস ওয়ান ভিখারী৷ সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগায়!
আমিতো শক্তি কাপুরদের থেকে তেমন কোনও শিক্ষালাভ করতে পারি নি৷ ক্যামেরাম্যান কিংবা অভিনেতা নই, তাই এ্যাক্টিংও বুঝি না৷ ওদেরটাও ঠিকমতো বুঝলাম না৷ প্রসেনজিৎ এর কথাও পুরোটা বুঝলাম না৷ সবটা সেলুনে না যাওয়া জটাধারী বাবার মতো লম্বা লম্বা চুলে ভর্তি - আমার মাথার উপর দিয়ে চলে গেলো৷
দশটাকা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দশ মিনিটে প্রফেসর পি সি সরকারের মতো ভ্যানিশ হয়ে গেলো....
পরে শুনলাম; তনুশ্রী বৌমার কাছ থেকে মেয়ের বিয়ের বাহানা করে ওরা কুড়ি টাকা নিয়ে গেছে৷
একশ্রেণীর মানুষ আছে, তারা ভিক্ষা করে খাবে, কিন্তু কখনোই কাজ করে পেট ভরাবে না৷ এদের না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন৷ সেই কঠিন কাজটি আজ করলাম৷
©Samaresh Subodh Paria®2020
Comments
Post a Comment
Khejuri Live -এ আপনাকে স্বাগত জানাই। আপনার নজরে আসা খবর, ঘটনা জানতে পারেন আমাদের। আমাদের সাথে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমাদের উৎসাহ দিতে পেজটি লাইক ও পোস্ট শেয়ার করবেন।
খবর জানাতে পারেন হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার 7872144541 এ, এছাড়াও করতে পারেন মেল- dasbhishmadev@gmail.com